কাচ্চি বিরিয়ানি
মধ্য এশিয়ার তুর্কি খাবার, শীত প্রধান ‘সমরখন্দ’ তুর্ক চাগতাই ভাষায় যার অর্থ চর্বির শহর। মোটা চর্বির লেয়ারযুক্ত লাল মাংসের খাবার যা সাধারণত ভেড়া বা খাসির মাংস থেকে পাওয়া যায়। যা গরুর মাংসের ভিতরে এতটা স্তরীভূত থকে না তাই কাচ্চির জন্য ভেড়া বা খসির মাংসই আাদর্শ। কাচ্চি রান্নায় অল্প আঁচে রান্না করার কারণে মাংসের চর্বি গলে গিয়ে চালের সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে কাচ্চির অপূর্ব স্বাদটা তৈরি করে। তুর্কিরা এই খবারে লবঙ্গ, ক্ষেত্রবিশেষে হিং, মাখন, গোল মরিচ, এলাচ ও স্থানীয় মসলায় সংমিশ্রণ ঘটত।
শীতপ্রধান এই অঞ্চলগুলোতে এই খাবারের প্রচলন শুরু করে তুর্কি চাগতাইরা, কাবুল অবস্থানের সময় গজনির কিসমিস, জাফরান মিশে কাচ্চির নতুনত্ব দান করে। তুর্কি বা মোঘলের ভারতে আগমনে কাচ্চির সাথে যোগ হয় কাশ্মীরি জাফরান, লবঙ্গ, দারুচিনি, জয়ত্রীর সংমিশ্রণ, মাখনের পরিবর্তে খাঁটি ঘি। জানা যায় মোঘল বাদশাহ জাহাঙ্গীরের সময় কাচ্চিতে আমদানি হয় আলু, টমেটো, ঘি-তে দেওয়া শুকনো মরিচের ফোরন, যা সমগ্র ভারতবর্ষ হয়ে ঢাকার খাদ্যে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। মোগল যাদের পাতে একসময় চর্বিতপ ডুবিয়ে রাখা বুড়ো ঘোড়ার মাংস আর শালগমের দুই এক টুকরো ছাড়া আর কিছুই জুটতো না সেই তারাই পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী আর রুপকথা তুল্য এক সালতানাতের জন্মদাতা। সেই তারাই জন্ম দিয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু খাবারগুলো।

ঢাকার অভিজাত পরিবার ও বিয়ের অনুষ্ঠানে জনপ্রিয় খবার কাচ্চি বিরিয়ানি। ঢাকার কাচ্চিতে চিনিগুড়া বা কালোজিরা চাল ব্যবহার হলেও কলকাতার রন্ধনে বাসমতী চালের ব্যবহার দেখা যায়। খুব দক্ষ বাবুর্চি বা রাধুনি ছাড়া কাচ্চি বিরিয়ানির মান, স্বাদ ও গুণাগুণ অটুট থকে না। কাচ্চির চালের অর্ধসিদ্ধ অবস্থায় খাসির মাংসের দমে রান্নার প্রয়োজন হয়। মসলার ঘি আলুবোখারাসহ বিশেষ কিছু মসলার যোগে সূক্ষভবে হালকা দমে ( কাঠ কয়লার ব্যবহার) রান্না হয়ে থাকে। ক্ষেত্র বিশেষে কাচ্চি বিরিয়ানিতে ইদানিং আলু যোগ করে স্বাদে ভিন্নতা আনা হয়। রান্নার জন্য খাসির মাংসে এক কেজির ছয় টুকরা উত্তম।
কাচ্চি বিরিয়ানি রান্নার অনেক ধরনের প্রক্রিয়া থাকলেও এটি যে ঢাকার খাদ্য ইতিহাসের এক বিশেষ খাদ্যপদ তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। ঢাকার এই সমৃদ্ধ খাদ্যের ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ ও অটুট রাখার ক্ষেত্রে কাচ্চি বিরিয়ানি অবশ্যই অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং এখনও সমানভাবেই রেখে যাচ্ছে।
তথ্যসূত্র: ঢাকাই খাবার ও খাদ্য সংস্কৃতি : সাদ উর রহমান
লেখক : আরিয়ান মাহমুদ খান