বিশ্বকবির ঢাকা ভ্রমন।

Spread the love

“এই কথাটি মনে রেখো..”

মাত্র ৩৭ বছর বয়সে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম ঢাকায় এসেছিলেন। দ্বিতীয়বার আসেন প্রায় ৩০ বছর পর। তখন রবির আলোয় আলোকিত বিশ্ব জোড়া এবং বয়স অস্তাচলে। যদিও ১৮৮০ সাল থেকেই পূর্ববঙ্গে বিশ্বকবির নিত্য যাতায়াত ছিলো। শিলাইদহে,পতিসরে, সাজাদপুরে বারবার এসেছেন থেকেছেন দিনের পর দিন। নৌকায় করে পদ্মার বুকে ঘুরে ঘুরে যাতায়াত করতেন পূর্ববঙ্গ থেকে কলকাতায়৷

প্রথমবার ১৮৯৮ সালে ঢাকায় আসেন প্রথমবার সে বছর বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনে যোগ দিতে ঢাকায় আসেন। ১৮৯৮ সালের ৩০শে,৩১শে মে ও ১লা জুন এই তিনদিন সম্মেলন হয়েছিলো, ভেন্যু ছিলো ক্রাউন থিয়েটার। রবীন্দ্রনাথ তখনও বিখ্যাত কেউ ছিলেন না, তাই তার জন্য আলাদা কিছু আয়োজন করা হয়নি। তবে পরবর্তীতে তার লেখায় পাওয়া যায় সে সময়ে মাত্রাতিরিক্ত অভ্যর্থনা পেয়ে তিনি হাঁপিয়ে উঠেছিলো। রবীন্দ্রনাথ ঢাকায় আসেন ২৯ শে মে। সে সময়ে তার শরীর তেমন ভালো ছিলো না তবুও সভায় অংশ নেওয়ার জন্য ঢাকায় আসেন।সম্মেলনের প্রথম দিনে সভাপতি রেভারেন্ড কালীচরণ ব্যানার্জির ইংরেজি ভাষণের বাংলা তরজমা করে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। দ্বিতীয় দিনে তিনি সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জির ইংরেজি ভাষণেরও বঙ্গানুবাদ করেন রবীন্দ্রনাথ। সম্মেলনের শেষদিন অর্থ্যাৎ ১ লা জুন রবীন্দ্রনাথ ঢাকা থেকে শিলাইদহ চলে গিয়েছিলেন। বাঙালিদের সম্মেলনে ইংরেজি বক্তব্য রাখার বিরোধিতা করেন রবীন্দ্রনাথ।

দ্বিতীয়বার ঢাকায় আসেন বিশ্বকবি ১৯২৬ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে। এর মাত্র কয়েকদিন আগে বিশ্বকবির জ্যৈষ্ঠ সহোদর দ্বিজেন্দ্রনাথ গত হয়েছিলেন কিন্তু তবুও তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে আসেন। গোপালচন্দ্রের “ঢাকায় রবীন্দ্রনাথ” বইতে বলা হয়েছে – রবীন্দ্রনাথ কলকাতা থেকে ট্রেনে গোয়ালন্দ, সেখান থেকে স্টিমারে করে নারায়ণগঞ্জ এবং সেখান থেকে মোটর শোভাযাত্রা করে ঢাকায় আসেন। সেসময়ে ঢাকায় তার সফরসূচি ছিলো ৯ দিনের।তার সফরসঙ্গী ছিলেন – রথীন্দ্রনাথ, প্রতিমা দেবী,নন্দিনী, দিনেন্দ্রনাথ, কালীমোহন ঘোষ এবং বিশ্বভারতীর তিন বিদেশী অধ্যাপক লিম, ফর্মিকি ও তুচ্চি এবং কবির সেক্রেটারি ফার্সি যুবক হিবজি ভাই মরিস৷

রবীন্দ্রনাথ ঢাকায় আসার পর কারো বাসায় না উঠে বুড়িগঙ্গায় একটি নৌযানে থাকতেন। সে দিনই লালকুঠিতে ঢাকার পৌরসভা ও নাগরিক কমিটির উদ্যোগে কবিকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। তখন অনেক লোক কবিকে দেখার জন্য ভীড় জমায়। রবীন্দ্রনাথকে ডে সময়ে ঢাকায় আনার বিশেষ অবদান ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক (পরে উপাচার্য) ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার। তাই তিনি চেয়েছিলেন কবি তার বাসায় থাকুন কিন্তু সমাজের বিশিষ্ট নাগরিকেরা তা মেনে নিতে চাননি। তাদের মতে কবি শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথি নন, তিনি সমস্ত ঢাকাবাসীর অতিথি। শেষপর্যন্ত কবি ওয়াইজ ঘাটে বাঁধা ঢাকার নবাবদের রাজকীয় জলযান তুরাগ হাউস বোটে গিয়ে উঠেন। দুদিন পর রমেশচন্দ্র মজুমদারের বাসায় যান। সারা ঢাকা থেকে বহু লোকের বাড়ি থেকে নানা খাবার পৌঁছে দেওয়া হতো কবির জন্য। ভাওয়ালের রজবাড়ি থেকে দুই ঘোড়ায় টানা ফিটন গাড়ি পাঠানো হয়েছিলো যাতায়াত করার জন্য। ১০ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকটি সভা ও সংবর্ধনায় অংশ নিয়েছিলেন।

প্রথমবার ঢাকায় এসে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনে বাংলা ভাষার পক্ষে তার চেষ্টার কথা জানান দ্বিতীয় বার ঢাকার আসার পর। তিনি বলেন- “বহুকাল আগে ঢাকায় এসে সম্মেলনে ইংরেজিতে ভাষাতেই বক্তৃতা দিতে হয়েছিল।” দ্বিতীয়বার ঢাকায় আসার পর মুসলিম হলের ছাত্রদের সংবর্ধনার জবাবে রবীন্দ্রনাথ চমৎকার ভাষন দিয়েছিলেন। এই হলের ছাত্র সংসদ থেকে তাকে “আজীবন সদস্য” পদ প্রদান করা হয়েছিলো।

১৫ ফেব্রুয়ারী জগন্নাথ হল বার্ষিকী ” বাসন্তিকা”র জন্য লেখেন সেই বিখ্যাত গান ‘এই কথাটি মনে রেখো’। সেদিনই তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন।ঢাকাতে কবি অনেক সভায় যোগ দেন, অনেক অভিভাষনও দিয়েছিলেন। যেগুলো ছিলো আত্নমর্যাদা, আত্নোপলব্ধি ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য নির্ধারনে তার নিজ অভিব্যক্তি।

তথ্যসূত্র: স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী ঢাকা-মুনতাসীর মামুন


Spread the love

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *