বিদ্যু বাতি জ্বলে ছিলো ঢাকা শহরে।

Spread the love

১৮৭৯ সালের ২২ শে অক্টোবর তারিখ টমাস আলভা এডিসন ক্যালিফোর্নিয়াতে প্রথম বিজলি বাতি জ্বালিয়ে বলেছিলেন – “আমরা এই জ্বালানোর খরচ এতো সস্তা করে দেব যে ভবিষ্যতে মোমের বাতি জ্বালাবে শুধু ধনীরা।” রেড়ি তেলের দাপট কতটা ছিলো তা আমরা রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বঙ্কিমচন্দ্র সহ পুরোনো বাংলা উপন্যাস পড়লেই বুঝতে পারি তাই না! ১৮৮২ সালের ৪ঠা সেপ্টেম্বর টমাস আলভা এডিসন সুইচ টিপে নিউ ইয়র্ক শহরের পার্ল স্ট্রিটে ৫৯ জন গ্রাহকের বাড়িতে বিজলি বাতি জ্বালিয়েছিলেন।

ব্রিটেনের রানী ভিক্টোরিয়াকে ভারত সম্রাজ্ঞী হিসেবে ঘোষনা উদযাপনের জন্য ১৮৭৭ সালে ঢাকা শহরে সনামধন্য নাগরিকদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি নানা উৎসব আয়োজনের অংশ হিসেবে ওয়াইজঘাটে অবস্থিত সেসময়ে ঢাকা মিউনিসিপ্যাল অফিস থেকে চকবাজার পর্যন্ত রাস্তা আলোকিত করতে ১০০ টি ল্যাম্পপোস্ট বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এক বছর পর কমিটির সদস্যদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে (চাঁদার পরিমান ছিলো ৬০০০ টাকা) ল্যামপোস্ট বসানো হয়েছিলো এবং ল্যামপোস্টে ৬০ টি কেরোসিনের বাতি লাগানো হয়েছিলো। প্রতিদিন সন্ধ্যায় মিউনিসিপ্যালিটির লোক লম্বা লম্বা মই নিয়ে এসে এগুলো জ্বালিয়ে দিতো।

১৮৮৬ সালে ঢাকার নবাব খাজা আবদুল গনিকে”স্যার” উপাধি দিবে ব্রিটিশ সরকার। এই খুশিতে নবাব পুত্র নবাব খাজা আহসান উল্লাহ কথা দেন তার পিতাকে যদি সত্যি সত্যি এই সম্মান দেওয়া হয় তবে তিনি ঢাকাবাসীকে খুশি করে দেবেন। সেই বছরেই খাজা আবদুল গনিকে ব্রিটিশ সরকার “নাইট কমান্ডার অব স্টার অব ইন্ডিয়া” উপাধি দেওয়া হয়। তখন কলকাতার “ইংলিশম্যান” পত্রিকায় সাক্ষাৎকারে নবাব আহসান উল্লাহ বলেন- ঢাকা শহরের প্রধান প্রধান সড়কে যেসব কেরোসিন বাতি জ্বলে সেসব সড়কে গ্যাসের বাতি জ্বালিয়ে দিবেন নিজের ব্যক্তিগত খরচে। তবে তিনি একটি শর্ত জুড়ে দেন তা হলো- ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটিকেও নগরবাসীর সুবিধার্থে পয়ঃনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্য সুবিধা বাড়াতে হবে। এছাড়া প্রয়োজনীয় ফায়ার ইঞ্চিন কিনতে হবে এবং সেগুলো সঠিক রক্ষনাবেক্ষন করতে হবে।

ভারতের বড় লাট লর্ড ডাফরিন ১৮৮৮ সালে ঢাকা পরিদর্শন এসে নবাব আহসান উল্লাহর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কেরোসিনের সড়ক-বাতির পরিবর্তে গ্যাসের সড়ক-বাতি লাগানোর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১৮৯১ সালে নবাব আনুষ্ঠানিক ভাবে মিউনিসিপ্যাল কতৃপক্ষকে গ্যাসের সড়ক বাতি লাগানোর প্রস্তাব দেন৷ ১৮৯৭ সালে সে সময়ে সর্বাধিক প্রচারিত বাংলা পত্রিকা “ঢাকা প্রকাশ” এ প্রচারিত হয়।

১৯০১ সালে নবাব আহসান উল্লাহ ইলেকট্রিক লাইট ফান্ড গঠন করে তাতে সাড়ে চার লাখ টাকা ডোনেশন করেন। ঐ বছর ৫ই জুলাই ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির তত্ত্বাবধানে “দ্য ঢাকা ইলেকট্রিক লাইট ট্রাস্ট” গঠন করা হয়। ঢাকা শহরের রহমতগঞ্জ, চকবাজার, সার্কুলার রোড, মোগলটুলি রোড, নালগোলা রোড, পাটুয়াটুলি রোড, বাংলাবাজার রোড, ডাল বাজার রোড, ফরাশগঞ্জ, লোহারপুল রোড, দিগবাজার রোড, ভিক্টোরিয়া পার্ক, লক্ষীবাজার, সদরঘাট, শাখারীবাজার,জনসন রোড, নবাবপুর রোড, রেলওয়ে স্টাফ কোয়ার্টার রোড, জামদানী নগর রোড ও রাজার দেউড়ি লেনে বিদ্যুৎ বাতি লাগানো হয়ে বলে ট্রাস্টের পক্ষ থেকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। ঐ ঐতিহাসিক ঘটনার দিন বাংলায় ছোট লাট স্যর জন উডবার্নকে আগেই আমন্ত্রণ জানানো হয় কিন্তু সে সময়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পরেন বলে আসতে পারেন নি। পরে কলকাতা থেকে সি.ডাব্লিউ বোল্টন এসেছিলেন।

১৯০১ সালের ৭ই ডিসেম্বর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। আহসান মঞ্জিলের চারপাশে লোকে-লোকারন্য হয়ে যায়। কারন তখন সেখানে বিশাল মঞ্চ বানানো হয়। মঞ্চের মাঝ খানে স্যর বোল্টন, ডান পাশে নবাব আহসান উল্লাহ এবং বা পাশে মিউনিসিপালিটির কমিশনারবৃন্দ বসে ঢাকার রাস্তায় গ্যাসে চালিত বিজলি বাতি উদ্ভোদন করেন।

তথ্যসূত্র: স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী ঢাকা-মুনতাসীর মামুন


Spread the love

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *