পাসান্দ বা সুতলি কাবাব
কাবাবের আদি যুগ বলতে ৩৫০০ হাজার বছর আগের আজকের গ্রিসের মিনোয়ান সভ্যতা দিয়ে দশম শতকে ইবনে সাইয়ার আল ওয়াররাক সংকলিত কিতাব আল তারিখ পর্যন্ত। বাগদাদি খাবাবের প্রথম কুকবুক। পশ্চিম এশিয়ার বিশেষ করে বাগদাদের বাবুর্চিরা কাবাবকে প্রায় তার আধুনিক সূক্ষ্মতায় এনেছিলো। চতুর্দশ শতকের মাঝামাঝি বা তার কিছু আগে থেকেই কাবাব তৈরীতে নানা যন্ত্রের ব্যবহার দেখা যায়। উন্নতমানের লিভার যন্ত্রও আগুনের ওপর মাংসের শিককে ক্রমাগত ঘোরাতে হয় এমন রান্না আবিস্কার হয়ে যায়। সেই অর্থে ১৪ শতকে ধীরে ধীরে শুরু কাবাবের আধুনিক কাল অর্থাৎ কাবাব রসনার এক নতুন অধ্যায়ের শুরু হয়৷
আদিম যুগের মানুষেরা আগুনে পুড়িয়ে ঝলসানো মাংসের সূক্ষ্মতার রূপ দিয়েছে তুর্কি, ইরানী আর ভারতীয় মোগলরা। উপমহাদেশে কাবাবের বিকাশ বহিরাগত মঙ্গোলীয়দের দ্বারা উত্তর ভারতে ঘটলেও মোগলরা কাবাবে বৈচিত্র্য নিয়ে আসে পারস্য-তুর্কি প্রভাব গ্রহন করে। সৃষ্টি করেছিলো কাবাবের নিজস্ব স্বকীয়তা।

এককালের বাংলার মোগল রাজধানী ও নায়েব নাজিমের শহর ঢাকার কাবাবের রয়েছে নিজস্বতা। ঢাকার বিখ্যাত পাসন্দের কাবাব বা সুতলি কাবাবকে অবলীলায় বলা যায় ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সৃষ্টি। মোঘলদের সঙ্গে আসা তাদের নিজস্ব বাবুর্চিরা মোঘলদের পছন্দের রুটি ও কাবাব তৈরী করতেন। গরু বা খাসির মাংস দিয়ে তৈরী হয় সুতি কাবাব। সাধারনত রমজান মাসে ইফতারের বেশ জনপ্রিয় আইটেম এই কাবাব। ঢাকার সাথে কাবাব এর সম্পর্ক কয়েক শত বছরের পুরোনো। ঢাকার ঐতিহ্যের মূল কাবাব পারসন্দের বা শিক কাবাব একে “সুতি কাবাব” নামেও অনেকে ডাকতেন। এখন এটি ঢাকাবাসীদের কাছে “সুতলি কাবাব” বা “সুতি কাবাব” নামেই জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ঢাকার প্রবীণ বয়োজ্যেষ্ঠ যারা আছেন তারা এখনও সুতি বা সুতলি কাবাব ছাড়া অন্য কোন কিছুকেই কাবাব বলে মনে করেন না।
ঢাকার নবাবদের আমলে জুম্মন রুটিওয়ালা নামের একজন ব্যাক্তি এই কাবাবটি প্রথম তৈরী করেন। কাবাব তৈরীর মূল উপকরন মাংস এবং মসলার সাথে সুতা। এটি বেশ মজার বিষয়।অনেক ভোজনরসিক আছেন যারা সারা বছরই এমন মজাদার কাবাব খেতে পছন্দ করেন। হাজারো কাবাবের ভীড়ে এখনও ঢাকার লোকেরা সুতি কাবাবকে তাদের নিজস্ব কাবাব বলে মনে করেন।
এক একটি শিকে পনেরো থেকে বিশ সের পরিমাণে মাংসের দিয়ে তৈরী হতো শিক কাবাব। কালের বিবর্তনে তা সম্পূর্ণ কাবাবের গায়ে সুতার বাঁধুনি কারনে তা সুতি বা সুতলি কাবাব নামে পরিচিতি লাভ করে। এই কাবাবের বিশেষত্ব এই যে মাংস ঝলসানোতে সিদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু তা ভঙ্গুরতা বা শুকনো হয়, প্যাচপ্যাচে ভাব থাকবে না। ভাঙ্গা বা খোলার সময়ে চুর চুর হয়ে যায় এবং আস্ত বের করা সম্ভব হয় না৷ শিকের ভারি কাবাব সুতা দিয়ে পেঁচানো থাকে। মসলাগত ও কাবাবির গুণে তৈরী হয় জমাট বাঁধা উপরে মচমচে পোড়া, ভিতরে মাটির মতো নরম সংরক্ষণযোগ্য পাসান্দ বা সুতলি কাবাব।
এই কাবাব আগে ঘরে তৈরী হলেও বানানোর জন্য বিশেষ কারিগরি দক্ষতা ও জ্ঞানের প্রয়োজন হয়। ঢাকায় রমজান ও কোরবানি ইদের সময়ে এই শিক কাবাব তৈরীর প্রচলন বেশী দেখা গেলোও সারাবছর পুরান ঢাকায় সুতলি কাবাব পাওয়া যায়। এই কাবাব তৈরিতে মাংসের সাথে মসলা ও বেসনের ভারসাম্য মেশানো ছাড়া অন্য কোন কিছুই দেয়া হয়না।

গরুর গোশত (হাড় ছাড়া) ২ কেজি
উপকরন
পেঁপে বাটা- ১ টেবিল চামচ
রসুন বাটা- – ১ টেবিল চামচ
পোস্তদানা- – ১ টেবিল চামচ
আদা বাটা- – ২ চা চামচ
গোলমরিচ গুঁড়া – দেড় চা চামচ
কাবাব মসলা- ১ চা চামচ
লবণ- দেড় চা চামচ (পরিমানমত)
টক দই- ৩ টেবিল চামচ
মরিচগুঁড়া – ১ চা চামচ
লেবুর রস- – ১ টেবিল চামচ
পেঁয়াজ বেরেস্তা- হাফ কাপ
ঘি বা মাখন- হাফ কাপ

সুতলি কাবাব প্রস্তুত প্রণালি
গরুর গোশতকে বড় বড় টুকরো করে কেটে নিয়ে শিলপাটা বা কাঠের হাতুড়ি দিয়ে হালকা থেঁতলে পাতলা রুটির মতো করে নিতে হবে। এরপর সকল উপকরণ দিয়ে ১-২ ঘন্টা মাখিয়ে রাখতে হবে৷ একটি শিকে গোশতের পাতলা টুকরাগুলো এক বা দুই ফোঁড়ে গেঁথে মোটা চুড়ির মতো করে পেঁচিয়ে কাঠ কয়লার আগুনে ঝলসানোর জন্য দিতে হবে। শিক ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঝলসান এবং একপাশ টেনে এনে ঘি বা মাখন ব্রাশ করে উল্টে দিতে হবে। কাবাব পোড়া পোড়া হয়ে এলে নামিয়ে কেটে কেটে পরিবেশন করা হয় রুটি, পরোটা, বাকরখানি দিয়ে। ঝড়ঝড়ে শুকনো পাসান্দের কাবাব সংরক্ষণ করে দীর্ঘদিন খাবার উপযুক্ত থাকে।
তথ্যসূত্র: ঢাকাই রন্ধনশৈলী, সাদ উর রহমান
উম্মে সাহেরা এনিকা
ওনার: তেজস্বী, কোষাধ্যক্ষ: ইডিসি, ফাউন্ডার: ঢাকাপিডিয়া
সবসময় সুতি কাবাব জেনে আসলেও আজকে পরিষ্কার হলাম পাসান্দ বা সুতলি কাবাব নিয়ে😊
ঢাকার খুব পরিচিত সুতলি কাবাব। ধন্যবাদ আপনাকে ভাই।
খুবই ভালো লেগেছে পাসান্দ বা সুতলি কাবাব নিয়ে বিস্তারিত জানতে পেরে।আপু আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ এত বিস্তারিত ভাবে তুলে ধরাএ জন্য। যদিও সুতলি কাবাব খেয়েছি বেশ কয়েকবার কিন্তু বিস্তারিত জানা ছিলো না। শুভ কামনা রইলো আপু আপনার জন্য এবং ঢাকাপিডিয়ার জন্য।
ভালো লাগলো আপু আপনাদের আগ্রহ দেখে।
অসংখ্য ধন্যবাদ
পুরান ঢাকার এই সুতলি কাবাবের উৎপত্তি এখানেই। এটি পুরান ঢাকার জিআই পণ্য হওয়ার দাবিদার। ঢাকাপিডিয়াকে ধন্যবাদ সুন্দর এই আর্টিকেলের জন্য 🥰🥰
আপু ২০২৩ সালে আপনি প্রথম জিআই পণ্য নিয়ে কাজ করার আইডিয়া দেন। এক বছরে আপনি অনেক কষ্ট করেছেন।স্যারের গাইডলাইনে যে কেউ যে কোন জায়গা থেকে সেরা হতে পারে আপনি এর দৃষ্টান্ত। আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা ভালোবাসা নিবেন।
পুরানঢাকার ঐতিহ্যবাহী একটি খাবার। আপনার লেখাতে সব তথ্য উঠে এসেছে। কাবাব টি আমাদের দেশের সাম্ভাব্য জিআই পন্য। অসংখ্য ধন্যবাদ
খাবারে ঢাকা সমৃদ্ধ। সুতলি কাবাবের ইতিহাস অনেক পুরোনো তাই এটি ঢাকার সম্ভব্য জিআই পণ্য। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আপু
সুতলি কাবাব এর নাম শুনেছিলাম আগেই কিন্তু পুরান ঢাকার মেয়ে ও বউ হয়েও খাওয়া হয়নি।
তাই গত বছর এ কাবাব খাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিলো রোযার সময়।
আনন্দ বেকারির সুতলি কাবাব খেয়েছিলাম আর মনে হয় এ কাবাব অন্য সব কাবাবের থেকে স্বাদে অন্যরকম।
খাতুনে জান্নাত আশা আপু ঠিকই বলেছেন, এ কাবাব আসলেই জি আই পন্য হিসেবে স্বীকৃতি পাবার যোগ্যতা রাখে।
অসংখ্য ধন্যবাদ এনিকা আপুকে এভাবে এর বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরার জন্য।
সুতলি কাবাবের সম্পুর্ন ইতিহাস আমার জানা ছিলোনা, জানার ইচ্ছে থাকলেও অনলাইনে সুতলি কাবাব নিয়ে এতো বিস্তারিত লেখা কোনো কন্টেন্ট আগে কোথাও পাইনি, তাই ধন্যবাদ “ঢাকাপিডিয়া” কে।
পাসান্দ বা সুতলি কাবাব পুরান ঢাকাবাসী’র কাছে সুতি কাবাব নামেও বেশ পরিচিত।
পুরান ঢাকার আনন্দ বেকারিতে সুতলি কাবাব সারাবছর পাওয়া যায় এছাড়াও পবিত্র রমজান মাসে চকবাজারে ইফতার উপলক্ষে পাওয়া যায় এবং বড় বড় রেষ্টুরেন্ট গুলোও তৈরি করে থাকে।
তবে যারা বাসায় তৈরি করে খেতে চায় তাদের জন্য এই কন্টেন্ট টি আরও আকর্ষণীয় কারন এখানে সুতি কাবাব তৈরির সকল উপাদান ও প্রস্তুত প্রনালী দেওয়া হয়েছে।