ঢাকার বনেদি পরিবার মথুরানাথ দাস।
১৯ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে, ঢাকা শহরে ধনে মানে, নবাব পরিবারের পরই বোধ হয় স্থান ছিলো রূপলাল দাস এবং তার পরিবার। রূপলালের বাড়ি, “রূপলাল হাউস, “নবাববাড়ি” বা “আহসান মঞ্জিল” কোন অংশে কম ছিলো না। রূপলালের কথা বলতে গেলে তার পূর্বপুরুষ মথুরানাথ বা তার বংশধরগণ কিভাবে সম্পদশালী হয়ে উঠে সে গল্প বলতে হবে।
বুড়িগঙ্গার ওপারে শুভাড্যা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মথুনারাথ সাহার। ব্যবসা তার পোদ্দারির, সে কারনে তাকে মথুরানাথ পোদ্দারও বলা হতো। পোদ্দাররা প্রথমদিকে মুদ্রা ভাঙ্গিয়ে দেওয়ার কাজ করতেন। এছাড়া মহাজনী ব্যবসাও করতেন। মথুরানাথ প্রতিদিন শুভড্যা থেকে চলে আসতেন ঢাকায়। তখন আঠারো শতকের শেষ ভাগ। বাংলা বাজারের রাস্তায় চট বিছিয়ে দিনের কাজ শুরু করতেন মথুরানাথ। এক টাকা ভাঙালে বাট্টা দিতে হতো এক পয়সা। আধুলি বা সিকি ভাঙালে কড়ি। ঢাকায় তখনও মুদ্রা হিসেবে কড়ির চল ছিলো।
মথুরানাথের ব্যবসা দিন দিন উন্নতি হতে থাকলো এবং এক সময় তার সাজানো গোছানো গদি বা দোকানের প্রয়োজন অনুভব করলেন তিনি। বাংলা বাজারে ছোট একটু জমি কিনে ইট ও কড়ি পোড়ানো চুন দিয়ে তৈরী করলেন তার গদি বা দোকান। এই দোকানটি এখনও আছে বাংলা বাজারে “নওরোজ কিতাবস্তান” নামের দোকান মথুরানাথের দোকান।
দোকান হওয়ার পর মথুরানাথ বাট্টার ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছিলেন, কারন এতে তার সম্মানের কিছুটা দাগ পরে। তিনি তখন শুরু করেছিলেন লগ্নি ও হুন্ডির ব্যনসা। তখন তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলো “ব্যাংক অফ বেঙ্গল”। কিছুদিনের মধ্যেই দেখা গেলো মথুরানাথের ব্যবসা ফুলেফেঁপে উঠছে। প্রতিদিন আর ঢাকা-শুভড্যা করা সম্ভব নয়। তাই তিনি শুভড্যার বাস উঠিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করার জন্য চলে এসেছিলেন ঢাকায়।
মথুরানাথের ছিলো দু’ছেলে স্বরূপচন্দ্র ও মধুসূদন। তারাও সাহায্য করতেন পিতার ব্যবসায়। খুব সম্ভব, উনিশ শতকের প্রথমার্ধে হুন্ডির কারবারে মন্দা দেখা দিলে দাস পরিবার লগ্নিতেই টাকা খাটাতেন বেশী করে। সে সময়ে টাকাপ্রতি ছিলো দিনে এক পয়সা সুদ, যার অর্থ একশ’ টাকা ধার দিলে এক বছরে এর উপর সুদ পাওয়া যেত পাঁচশ সত্তর টাকা। তখন ব্যাংকে না গিয়ে মহাজন থেকে নিতো ঐতিহ্যের ব্যাপার ছিলো।
মহাজনী কারবার ফুলে ফেঁপে উঠলেও ঢাকার সমাজে দাস পরিবার তখনও সম্মানজনক আসন করে নিতে পারেন নি। কারন তারা জমিদার ছিলেন না। জমিদারি কিনে আভিজাত্য অর্জনের চিন্তা করেছিলেন প্রথম মধুসূদন। তিনি প্রথম জমিদারি কেনা শুরু করেছিলেন এবং জমিদারি মহাজনি ব্যবসা। এ দু’য়ের ফলে দাস পরিবার ঢাকায় অচিরেই হয়ে উঠেছিলেন অভিজাত প্রতিপত্তিশালী পরিবার। ১৮৬৪ সালের প্রচন্ড দুর্ভিক্ষের সময় সনাতন দুর্ভিক্ষের পীড়িত মানুষদের কয়েক লাখ টাকা সাহায্য করেছিলেন। ঢাকা বাসি তখন সনাতনের নাম দিয়েছিলেন সাধু সনাতন। সনাতনের এমন আচরণে পরিবারের লোকেরা বিরোধীতা করেছিলো। সনাতন ছিলো বড়, তার বাকি ছোট ভাইয়েরা মনে করেছিলো এভাবে দান করতে থাকলে তাদের সম্পদে টান পরবে। তাই সনাতনের ভাই রূপলাল,রঘুনাথ ও স্ত্রী অনপূর্ণা মামলা করেছিলেন সনাতনের বিরুদ্ধে। এজমালী সম্পত্তি নস্ট হওয়ার আশংকায়।
সনাতনরা তিনভাই প্রথমে থাকতেন হেমেন্দ্র দাস লেনের ৬ নং বাড়িতে। মথুরানাথই প্রথমে এখানে বসবাস শুরু করেন৷ ঐ বাড়ি ছেড়ে তারা উঠেছিলেন নতুন একটি বাড়িতে, যেটি এখন ‘মুক্তধারা’র কার্যালয়। তখন বাড়িটির নাম ছিলো ‘মোহিনীমোহন’। এই বাড়ি ছেড়ে পরে তারা তৈরী করেন ‘সবজি মহল ‘। এ কারনে তারা সবজি মহলের জমিদার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
বেশ কয়েকটি মামলার পর একান্নবর্তী থাকা আর সম্ভব নয় বলে রঘুনাথ ও রুপলাল ফরাসগঞ্জে গিয়ে বাড়ি করলেন।রঘুনাথের বাড়ি হলো ‘রঘুবাবুর বাড়ি’ আর রূপলালের বাড়ি হলো ‘রূপলাল হাউস’ নামে। সনাতন থেকে গিয়েছিলেন ‘সবজি মহলে’।
রূপলালের জন্ম ১৮৪৫ সালে।তার সময়ই দাস পরিবারের সদস্যরা বই পত্রের সাথে পরিচিত হতে পেরেছিলো। তখন থেকে এ পরিবারের সদস্যরা স্কুলে যেতো তবে তারা পরীক্ষা দিতো না কিন্তু প্রমোশন পেতো। এন্ট্রান্স পাশ করার আগেই পড়াশোনায় ইতি টানতো।
তবে রূপলাল ছিলেন ভিন্ন। বাংলার পারিবারিক ইতিহাস অনুযায়ী, তিনি ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন এবং প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম হয়ে বৃত্তি পেয়েছিলেন দশ টাকা।কলেজের দ্বিতীয় বার্ষিক ক্লাসে উঠে পড়াশোনায় ইস্তেফা দেন।
রূপলাল জমিদারী ও ব্যবস্থা দুটোই চালিয়েছিলেন। টাকা যেমন আয় করতেন তেমনি অপব্যয়ও করতেন। ঢাকা শহরের উন্নয়নের তিনি বেশ মোটা অংকে দান করেছিলেন। উচ্চাঙ্গসংগীতের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তিনি। তার উত্তরাধিকাররাও তার ধারা বহাল রেখেছিলেন। ১৮৮৮ সালে লর্ড ডাফরিন ঢাকায় এসেছিলেন। রূপলাল দাসের বাড়িতে বল নাচের আসরে তিনি যোগ দিয়েছিলেন। রূপলাল দাস ১৯১৩ সালে মারা যান।
রূপলালের ছেলে রাধাবল্লভ ঢাকায় সর্বপ্রথম ইটের বৃহৎ কারবার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার কোম্পানির নাম ছিলো ‘কাওতাইল ব্রিক ফিল্ড’। তার দুই ছেলে রমেশচন্দ্র ও যোগেশচন্দ্রের মধ্যে রমেশচন্দ্র ছিলেন চিত্রশিল্পী। যোগেশচন্দ্র ছিলেন বিদোৎসাহী। ঢাকা থেকে প্রকাশিত সাময়িক পত্র “শান্তি” যার সম্পাদক ছিলেন তিনি। ঢাকায় তার নিজস্ব লাইব্রেরি ও ব্যায়ামাগার সে সময়ে অনেকের কাছেই বিষ্ময়কর বিষয় ছিলো।
রমেশচন্দ্রের পুত্র তারকানাথ পিয়ানো বাদক ও নাট্য নির্দেশনা হিসেবে নাম করেছিলেন। তার স্ত্রী সরমা দাস ঢাকা বেতার কেন্দ্রের প্রথম মহিলা উচ্চাঙ্গ যন্ত্রসংগীত শিল্পী ছিলেন। এ ছাড়াও ঢাকার প্রথম রেডিও ব্যবসা শুরু করেছিলেন তারকানাথ।
রূপলালের ভ্রাতুষ্পুত্র মোহিনী মোহন ছিলেন সে সময়ে ঢাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি। চাচাদের থেকেও আরো ছিলেন মোহিনী মোহন। তিনি তার স্ত্রীকে নিজ হাতে খুন করেছিলেন কিন্তু প্রভাবশালী হওয়ায় তার বিচার হয়নি৷ অল্প বয়সেই সমস্ত সম্পত্তি নষ্ট করে লাখ খানেক টাকা দেনা রেখে ১৮৯৭ সালে মারা যান।
রূপলালের বংশ ধরেরা ১৯৪৮ সালে দিকে ঢাকা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন কলকাতায়৷
তথ্যসূত্র: স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী ঢাকা-মুনতাসীর মামুন
লেখক: উম্মে সাহেরা এনিকা