ধোলাই খালে হতো নৌকা বাইচ!
ধোলাই খাল এলাকার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় লোহালক্কর, গাড়ির কলকব্জা এসবের শব্দ পাওয়া যায়। খুব ব্যস্ত একটি এলাকা। যদিও এক সময় এখান দিয়ে সুন্দর খাল ছিলো তা বোঝার উপায় নেই৷ একদিকে নবাবপুর রোড, মৈশুন্ডী,দয়াগঞ্জ, অন্যদিকে রায়সাহেব বাজার, তাঁতিবাজার। এদিক দিয়েই বয়ে গিয়েছিলো দোলাই বা ধোলাই খাল।এটি খালের মত সরু ছিলো না বেশ প্রশস্ত ছিলো।
এই খাল বালু নদী হয়ে বের হয়ে ঢাকা ফরিদাবাদের কাছে বুড়িগঙ্গার সাথে মিশেছিলো। খালের একটি শাখা ঢাকা শহরের মধ্য দিয়ে বাবুর বাজারের কাছে বুড়িগঙ্গায় মিশেছে। ধোলাই খাল ১৮৬৪ সালে গভর্নমেন্ট ব্যয় সংস্কার করা হয়৷ ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে এপ্রিল মাস থেকে এই খালের মাসুল ধার্য করা হয়। ময়মনসিংহের মহাজনেরা এই পথে মালামাল আনা নেওয়া করতেন৷ ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে ধোলাইখালের উপর লোহা দিয়ে সেতু তৈরী করা হয়। সে সময়ে ওয়াল্টার সাহেব ছিলেন ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট।সে সময়ে ২৫০০০ টাকা ব্যয় হয় সেতু তৈরীতে।।
মোগল আমলের আগেও এখানে আরো একটি খাল ছিলো যা জেমস রেনলের ম্যাপে উল্লেখ রয়েছে। খালের প্রজেশমুখে বেগ মুরাদের কেল্লা নামে পাঠানদের একটি দুর্গ ছিলো।
এখনকার মত এতো সমতল ছিলো না পুরান ঢাকা। খাল,গর্ত, ডোবা,নালা, ঝিল ইত্যাদি ছিলো।পণ্য পরিবহনের সুবিধার জন্য মোগল সুবেদার ইসলাম খাঁ ধোলাই খালের সংস্কার করেন। ইসলাম খাঁ এর সংস্কার করা খালটি বাবুবাজারের কাছে বুড়িগঙ্গা থেকে শুরু তাঁতিবাজার হয়ে নবাবপুর ও নারিন্দা রোডের পাশ দিয়ে এগিয়ে গিয়ে সূত্রাপুর ও গেন্ডারিয়ার ভেতর দিয়ে মিলব্যারাকের কাছে আবার বুড়িগঙ্গায় মিলিত হয়। ধোলাইখালের আরেকটি অংশ তাঁতিবাজার ও মালীটোলায় সংযোগস্থল থেকে বংশাল হয়ে সুরিটোলার পশ্চিম দিক দিয়ে নাজিরাবাজার ও দেওয়ানবাজারের ভেতর দিয়ে শাহবাগ ঘুরে পুরান পল্টন ও মতিঝিলের দিকে চলে গিয়েছিলো।
সে সময়ে ধোলাইখালই ছিলো পণ্য পরিবহনের প্রধান মাধ্যম। বড় বড় নৌযান চলাচল করতো এই খাল দিয়ে তাই ধারনা করা বেশ প্রশস্ত ছিলো। এই খালে নৌকা বাইচ হতো। বহু লোক জড়ো হতো খালের দুই পাশে৷ নৌকা বাইচের নানান কল্প কথা পুরান ঢাকাইয়াদের মুখে মুখে প্রচলিত ছিলো।
খাল পারাপার জন্য বিভিন্ন মহল্লায় কাঠ ও বাঁশ দিয়ে সেতু বা সাঁকো বানানো হয়েছিলো। যাতে নিচ দিয়ে নৌকা বা পণ্য বাহী যান চলাচলের জন্য উঁচু রেখে তৈরী হয়। পুরান ঢাকায় এখনও কাঠের পুল নামে যে জায়গা রয়েছে তা ঐ রকম একটি পুলের কারনেই। ১৮৩০ সালে ঢাকার তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট ওয়াল্টার সাহেব স্থানীয় বাসিন্দাদের চাঁদায় লোহারপুল বানিয়ে গেন্ডারিয়ার সাথে শহরের বাকি অংশের যোগাযোগ সহজ করে দেন৷
ধোলাইখালের পানি ছিলো পরিস্কার। বাড়িগুলোর ব্যালকনি বানানো হতো ঝুলন্ত ও ফাঁকা। কিশোররা এই ব্যালকনি থেকে সরাসরি খালে ঝাঁপিয়ে পরতো।
তথ্যসূত্র: স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী ঢাকা-মুনতাসীর মামুন
লেখক: উম্মে সাহেরা এনিকা